শত শত নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে উখিয়ায় পালিত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
বিভিন্ন পর্বমালার সময়সূচি নিয়ে ছাত্ররা সকাল ৯ টা থেকে উখিয়া কেন্দ্রীয় শহিদ মিনাররে জড়ো হতে থাকে। এর পরপরই ধাপে ধাপে তাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
উখিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন ও সাধারণ সম্পাদক রিদুয়ানুর রহমানের নেতৃতে বিভিন্ন ইউনিয়ন,ওয়ার্ড থেকে শত শত নেতাকর্মীদের সমাগম ঘটেছে এ অনুষ্ঠানে।
উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য শাহাজাহান চৌধুরী, উখিয়া উপজেলা বিএনপি’র আহবায়ক সরোয়ার জাহান চৌধুরী,সদস্য সচিব সুলতান মাহমুদ চৌধুরী,সদস্য তারেক মাহমুদ রাজীব চৌধুরী, সাফফাত ফারদিন চৌধুরী,যুবদলের যুগ্ন আহবায়ক মনিরুল ইসলাম মনিরসহ অসংখ্য সিনিয়র নেতৃবৃন্দদের সাথে নিয়ে প্রাথমিকভাবে শহিদ মিনার থেকে উখিয়া স্টেশনের দক্ষিণ মাথা পর্যন্ত বিশাল র্যালি শোডাউন করা হয়। এর পরপরই বক্তাদের বক্তব্য, ফুটবল ম্যাচসহ বিভিন্ন আয়োজন সমাপ্ত করেন তারা।
শিক্ষাজীবন যেমন সমগ্র জীবনের প্রস্তুতিপর্ব, ঠিক তেমনি রাজনৈতিক জীবনের প্রস্তুতিপর্ব হলো ছাত্ররাজনীতি। সে কারণেই বিশ্বব্যাপী ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতিই ছিল আমাদের জাতীয় রাজনীতির নীতিনির্ধারণী ফোরাম। দেশ স্বাধীন হওয়া থেকে শুরু করে নব্বইয়ের গণআন্দোলন থেকে ২০২৪ এ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ আমাদের জাতীয় জীবনের গৌরাবোজ্জ্বল প্রতিটি অর্জনের সাথেই ছাত্ররাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তৎকালীন ছাত্র সংগঠনগুলোর যে উজ্জ্বল ভূমিকা থাকার কথাছিল, আওয়ামী দুঃশাসনের ফলে তা হয়ে ওঠেনি। বাকশাল কায়েমের মধ্যদিয়ে তো ছাত্ররাজনীতির বিকাশ স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। সে সময় সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ব্যালটবাক্স ছিনতাইসহ নানা অপকর্ম করে ছাত্র রাজনীতির অতীত গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে শহীদ জিয়া শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস দূরীকরণ, সহাবস্থান নিশ্চিতকরণ, সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। প্রতিষ্ঠার পরপরই শহীদ জিয়ার আদর্শে গড়া ছাত্রদল দেশের শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল-এই নামটি শুধু একটি সংগঠনের পরিচয় নয়, বরং এটি দীর্ঘ ইতিহাস ও সংগ্রামের ধারক।
১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যে সংগঠনের যাত্রা শুরু, সেটি কেবল ছাত্ররাজনীতির অঙ্গনকেই আলোকিত করেনি, বরং স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, এবং প্রগতির পথে একটি জাতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে আপোসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য নেতৃত্বে ছাত্রদল আশাতীত ভূমিকা রাখে এবং ৯০’র গণঅভ্যুত্থানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ও জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়। বিগত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধান টার্গেট ছিল ছাত্রদল। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছরের চরম জুলুম-নিপীড়ন, গুম, হামলা-মামলা দিয়ে জনপ্রিয় ছাত্রসংগঠনটিকে পর্যুদস্ত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সংগ্রাম যাদের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে তাদেরকে দমন করার সাধ্য কার! দেশনেত্রী বেগম খালেদাজিয়া এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যোগ্য নির্দেশনায় ছাত্রদল কণ্টকাকীর্ণ পথেও লড়েছে অবিরাম, রেখেছে ইস্পাত কঠিন ঐক্য।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আজ এক নতুন প্রত্যয়ে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেমেছে। তাদের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা প্রস্তাবনাকে সামনে রেখে তারা শিক্ষার্থীদের মাঝে গণজাগরণ সৃষ্টি করছে। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে মতবিনিময়ের মাধ্যমে তারা শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করছে যে, শিক্ষাঙ্গণ শুধু জ্ঞান অর্জনের স্থান, সেখানে সহশিক্ষা কার্যক্রম ও ভীতিহীন পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের পেটোয়া বাহিনী ও নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নিপীড়ন ও সহিংসতার কারণে শিক্ষার পবিত্র অঙ্গন কলুষিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত করে আবারও শিক্ষার প্রকৃত পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব আজ ছাত্রদলের কাঁধে।
ছাত্রদল জানে, ছাত্ররাজনীতি শুধুই রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার নয়; এটি হতে পারে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সোপান। তারা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য শিক্ষার পরিবেশ পুনরুদ্ধারের মিশনে নেমেছে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী ভয়মুক্ত পরিবেশে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করে তারা বোঝাতে চায়, রাজনীতি হলো জনসেবার মাধ্যম, সহিংসতা ও আধিপত্যের নয়। ক্যাম্পাসে তারা শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করে শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। জাতীয় ঐক্য ও মুক্ত গণতন্ত্রের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে কাজ করছে, যেন একটি শিক্ষিত, আত্মনির্ভরশীল, ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার পথে তারা নেতৃত্ব দিতে পারে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল উখিয়া উপজেলার সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, “ছাত্রদল জন্মলগ্ন থেকেই মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে সোচ্চার ছিল। ৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২৪ এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানসহ সব আন্দোলনেই ভূমিকা রেখেছে ছাত্রদল। পাশে দাঁড়িয়েছে মানুষের বিপদে-আপদেও মানুষের পাশে থাকে ছাত্রদল সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও করোনা রমহামারি আঘাত করেছিল। সে সময়েও সারাদেশে আমাদের নেতাকর্মীরা টিউশনি জমানো টাকা কিংবা শখের কোন মূল্যবান জিনিস পর্যন্ত বেচে দিয়ে আর্থিকভাবে অসহায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের অধিকারের সাথে সংগতিপূর্ণ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার ছিল। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নোভ্যাট আন্দোলন, চাকুরি প্রত্যাশীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন, সবশেষ জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ত্যাগকে এই জাতি গৌরবের সাথেই মনে রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শুধু ছাত্রদলেরই ২শতাধিক শহীদ বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম একটি অংশ বলে মনেকরি।“
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল উখিয়া উপজেলার সাধারণ সম্পাদক রিদুয়ানুর রহমান বলেন, “ছাত্রদলের ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমরা প্রথম সারিতে ছিলাম। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে রাজপথ কাঁপিয়ে তুলেছিলাম। এরশাদের পতনের পেছনে ছাত্রদলের সাহসী ভূমিকা ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।ছাত্রদলের সংগ্রামের মূল প্রেরণা আমাদের শহীদ নেতা কর্মীদের আত্মত্যাগ। ২০২৪ এর অভ্যুত্থানে নিহত শহীদ মেহেদী হাসান রাব্বি, শহীদ জিসান এবং চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম কিংবা এর আগে পুলিশের গুলিতে নিহত নুরুজ্জামান জনিদের মতো তরুণরা জীবন উৎসর্গ করেছেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। দুইশতাধিক কর্মীর ত্যাগ ছাত্রদলের প্রতিটি নেতাকর্মীর হৃদয়ে চির স্মরণীয়। ছাত্র দলের ইতিহাস লড়াইয়ের ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস, ছাত্রদল পূর্বেও মাঠে ছিল, সামনের দিনে যে কোনো ছাত্রদের অধিকার আদায়ে ছাত্রদল মাঠে থাকবে।“
২০২৪ সালে ছাত্রদল কঠিন সময়ে দেশের গণতন্ত্রকামী ছাত্রসমাজকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছে। স্বৈরাচারী সরকারের নিপীড়ন ও নির্যাতন উপেক্ষা করে রাজপথে তাদের সাহসিকতা ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক আলেখ্য উপাখ্যান, অবিকল্প ইতিহাস। ছাত্রদলের এই লড়াই চলুক জনগণের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, ছাত্রসমাজের অধিকারের জন্য।